গল্প: বনসাই রহস্য
লিখেছেন - মৈত্রী রায়
শীতের সেই সকালে কুয়াশাটা যেন একটু বেশিই জেদি ছিল। লেকভিউ রোডের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা তিনতলা আভিজাত্যের প্রতীক ‘সেন ভিলা’ সাদা চাদরে ঢাকা পড়ে ছিল। সাধারণত সকাল সাতটার মধ্যেই বাড়িটিতে প্রাণের স্পন্দন জেগে ওঠে—গাড়ির হর্ন, মালি বিনোদের খুরপির শব্দ, আর বারান্দায় বসে অরিন্দম সেনের খবরের কাগজ ওল্টানোর আওয়াজে চারদিক সরগরম থাকে। কিন্তু সেদিন ছিল অস্বাভাবিক নীরবতা।
সকাল সাড়ে আটটায় পুরনো ভৃত্য হরিপদ হাতে চায়ের ট্রে নিয়ে বারবার অরিন্দম বাবুর স্টাডি রুমের দরজায় টোকা দিলেও কোনো সাড়া পেল না; দরজাটি ভেতর থেকে আটকানো। অদ্ভুত ঠাণ্ডা অনুভব করে সে মীরা সেনকে ডাকলে তিনিও ধাক্কা দিয়েও কোনো উত্তর পাননি।
শেষমেশ পাড়ার লোকজন ডেকে তালা ভাঙা হলে দরজা খুলতেই দেখা যায়, স্টাডি টেবিলের পাশে মেঝেতে অরিন্দম সেন পড়ে আছেন—চোখ দুটো অর্ধেক খোলা, যেন শেষ মুহূর্তে কিছু দেখার চেষ্টা করছিলেন, আর মুখে জমে আছে যন্ত্রণার নীলচে ছাপ।

পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করতেই বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। স্টাডি রুমটি ভেতর থেকে তালাবদ্ধ—একেবারে নিখুঁত ‘লকড-রুম মিস্ট্রি’। দরজার চাবি ছিল ভেতরেই, আর জানালাগুলোতে মজবুত লোহার গ্রিল বসানো; বাইরে থেকে কারও প্রবেশের সামান্য চিহ্নও নেই।
ঘরের ভেতর সবকিছু অস্বাভাবিক রকম গোছানো। স্টাডি টেবিলের ওপর ল্যাপটপ এখনো স্লিপ মোডে, স্ক্রিনে ক্ষীণ আলো জ্বলছে। পাশে অর্ধেক খাওয়া কফির কাপ, কাপে হালকা দাগ জমে গেছে—যেন শেষ চুমুকটি আর নেওয়া হয়নি।
বুকশেলফের বইগুলো যথাস্থানে, কাগজপত্র ছড়ানো নয়, কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই। দামী ঘড়ি, মোবাইল, নগদ অর্থ—সব অক্ষত। প্রথম নজরে বিষয়টি স্বাভাবিক মৃত্যুই মনে হয়েছিল, হয়তো হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন অরিন্দম সেন।
কিন্তু বিকেলের দিকে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আসতেই চিত্র বদলে যায়। চিকিৎসকরা জানান, মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ নয়—বিষক্রিয়া। আর সেটিও সাধারণ কোনো বিষ নয়, বরং ধীরগতিতে কার্যকরী এক অর্গানোফসফেট যৌগ, যা শরীরে প্রবেশের অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট পর লক্ষণ প্রকাশ করতে শুরু করে।
অর্থাৎ, অরিন্দম বাবু ধীরে ধীরে অসুস্থ বোধ করছিলেন—শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা অনুভব করার যথেষ্ট সময় ছিল তাঁর। তবুও তিনি দরজা খুলে সাহায্য চাননি, কাউকে ডাকেননি। এই অস্বাভাবিক নীরবতা এবং নিখুঁতভাবে বন্ধ ঘর পুলিশকে আরও ধাঁধায় ফেলে দেয়।
তদন্ত যখন একপ্রকার অচলাবস্থায় পৌঁছায়, তখনই কেসটি তুলে দেওয়া হয় অভিজ্ঞ গোয়েন্দা ইশতিয়াক রহমানের হাতে—যিনি জটিল রহস্যের জাল খুলতে বিশেষ সুনাম অর্জন করেছেন।
গোয়েন্দা ইশতিয়াক রহমান স্বভাবতই ধীরস্থির ও পর্যবেক্ষণপ্রবণ মানুষ। ঘটনাস্থলে প্রথম দিন তিনি কাউকে সরাসরি জেরা না করে পুরো সেন ভিলার পরিবেশ, মানুষের আচরণ এবং ঘরের বিন্যাস গভীরভাবে লক্ষ্য করতে শুরু করলেন। তাঁর বিশ্বাস—খুনি যতই চালাক হোক, পরিবেশ কখনো মিথ্যে বলে না।
অরিন্দম সেন ছিলেন ৫৬ বছর বয়সী এক সফল রাসায়নিক ব্যবসায়ী, যিনি নিজের পরিশ্রমে একটি বড় কেমিক্যাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করতেন তিনি; ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, নির্দিষ্ট সময়ে অফিস, আর রাত ১০টার পর স্টাডি রুমে একান্ত সময় কাটানো ছিল তাঁর অভ্যাস।
সেই সময়টুকু ছিল শুধুই তাঁর—বই পড়া, ব্যক্তিগত ডায়েরি লেখা, আর সবচেয়ে বেশি সময় দিতেন তাঁর প্রিয় বনসাই ও বিরল গাছগুলোর পরিচর্যায়। ছোট ছোট টব সাজানো থাকত জানালার ধারে; প্রতিটি গাছের সঙ্গে যেন তাঁর এক ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল।
বাড়িতে স্থায়ীভাবে থাকতেন তিনজন—স্ত্রী মীরা সেন, ছোট ভাই অয়ন সেন এবং বহু বছরের বিশ্বস্ত ভৃত্য হরিপদ। উপরিভাগে পরিবারটি শান্ত ও সচ্ছল মনে হলেও ইশতিয়াক দ্রুত বুঝতে পারলেন, এই নীরবতার আড়ালে চাপা টানাপোড়েন রয়েছে। অরিন্দমের মৃত্যুর পর মীরা দেবীর চোখে শুধু শোক নয়, এক ধরনের গভীর আতঙ্কের ছায়া স্পষ্ট—যেন তিনি কিছু জানেন, কিন্তু বলতে ভয় পাচ্ছেন।
অন্যদিকে ছোট ভাই অয়ন অস্বাভাবিকভাবে সংযত থাকার চেষ্টা করছে; প্রশ্ন না করলেও তার অস্থির হাত আর এড়ানো দৃষ্টি ইশতিয়াকের নজর এড়ায় না। মনে হচ্ছে, সে কোনো তথ্য গোপন করছে—অথবা এমন কিছু জানে, যা প্রকাশ পেলে পুরো রহস্যের মোড় ঘুরে যেতে পারে।
*** অন্য গল্প: ছয়টি তারে লুকিয়ে আছে, লিখেছেন - সত্যজিৎ রায়
পরদিন সকালে ইশতিয়াক রহমান আবার স্টাডি রুমে ঢুকলেন। আগের দিনের মতোই ঘরটি নিস্তব্ধ। জানালার কাঁচে কুয়াশার আস্তর, টেবিলে গুছিয়ে রাখা কাগজপত্র, বুকশেলফে সারি সারি বই—সবকিছু যেন অস্বাভাবিকভাবে নিখুঁত। চারদিকে একবার তাকিয়ে তিনি শান্ত গলায় বললেন, “ঘরটা বড্ড বেশি পরিষ্কার, তাই না?”
তাঁর সহকারী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “পরিষ্কার হওয়া কি খারাপ স্যার?”
ইশতিয়াক মৃদু হেসে বললেন, “পরিষ্কার হওয়া খারাপ নয়। কিন্তু যে মানুষটা প্রতিদিন রাত জেগে কাজ করে, ডায়েরি লেখে, গাছের যত্ন নেয়—তার টেবিলে অন্তত একটা খোলা কলম বা অর্ধেক লেখা নোট থাকার কথা। এখানে সবকিছু এমনভাবে সাজানো, যেন কেউ ইচ্ছে করে দৃশ্যটা তৈরি করেছে।”
তিনি কফির কাপটি হাতে নিলেন। কফি শুকিয়ে শক্ত হয়ে আছে, মানে বেশ অনেকক্ষণ আগেই রাখা হয়েছিল। ফরেনসিক জানিয়েছে, কফিতে বিষের কোনো চিহ্ন নেই। অর্থাৎ বিষ অন্য কোনো পথে শরীরে প্রবেশ করেছে। কিন্তু কীভাবে? ঘর ভেতর থেকে বন্ধ, জানালায় গ্রিল, ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই—তাহলে কি অরিন্দম নিজেই কিছু স্পর্শ করেছিলেন, না কি অজান্তেই শ্বাসের সঙ্গে বিষ ঢুকে গেছে শরীরে?
এই ভাবনার মাঝেই ইশতিয়াকের চোখ আটকে গেল ঘরের কোণে রাখা একটি ছোট জাপানিজ বনসাই গাছের দিকে। অরিন্দমের প্রিয় শখ। গাছটি সতেজ, কিন্তু টবের মাটি অস্বাভাবিকভাবে ভেজা—যেন কিছুক্ষণ আগেই স্প্রে করা হয়েছে। অথচ পরিবারের দাবি, ঘটনার পর থেকে ঘরে কেউ ঢোকেনি।
তিনি নিচু হয়ে বনসাইয়ের পাশে রাখা স্প্রে বোতলটি তুললেন। মুখের কাছে আনতেই ভ্রু কুঁচকে গেল। এক ধরনের তীব্র, তিতা রাসায়নিক গন্ধ। সাধারণ পানির মতো নয়। তিনি বোতলটি আলোয় ধরে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব ধীরে বললেন, “কখনো কখনো খুনি দরজা ভাঙে না… জানালাও নয়। সে ভরসা করে অভ্যাসের ওপর।”
সহকারী বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল। ইশতিয়াকের দৃষ্টি তখন গাছ থেকে সরে গিয়ে থামল টেবিলের ডায়েরির ওপর—ডায়েরির শেষ পাতাটি অর্ধেক খোলা। সেখানে কাঁপা হাতে লেখা একটি অসম্পূর্ণ বাক্য…
“আমি ভুল মানুষটাকে বিশ্বাস করেছি…”
কাকে বিশ্বাস করেছিলেন অরিন্দম? বনসাই কি শুধু গাছ, নাকি সেটিই ছিল নিখুঁত খুনের অস্ত্র? আর যদি বিষ স্প্রে করা হয়ে থাকে, তবে কে জানত তার এই রাতের একাকী অভ্যাসের কথা?
ইশতিয়াক জানতেন, উত্তর খুব কাছে। কিন্তু সেই উত্তরই হয়তো খুলে দেবে পরিবারের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভয়ঙ্কর এক সত্যের দরজা।
রহস্য এখানেই শেষ নয়… তদন্ত যত এগোতে লাগল, রহস্য তত জটিল হতে শুরু করল। ইশতিয়াক রহমান বুঝতে পারছিলেন—এই কেসের আসল শক্তি প্রমাণে নয়, আচরণে। এবং আচরণ বলছে, এই বাড়ির ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে আছে উত্তর।
প্রথমেই সামনে আসে মীরা সেন।স্বামীর মৃত্যুতে তার প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক ভাবে সংযত।চোখে জল আছে, কিন্তু সেই জল যেন ভয়ের সঙ্গে মিশে গেছে।অরিন্দমের মৃত্যুর পর পরই তাকে স্টাডি রুমের ড্রয়ারের কাছে কিছু খুঁজতে দেখা গেছে।পরে জানা গেল, অরিন্দম নতুন একটি উইল তৈরি করছিলেন—যেখানে সম্পত্তির বড় অংশ একটি ট্রাস্টের নামে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল।এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই পরিস্থিতি অন্য রূপ নেয়।
যদি উইল কার্যকর হতো, মীরা সেন আর আগের মতো সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতেন পারতেন না।বিলাস বহুল জীবন, সামাজিক প্রভাব—সবকিছু সীমিত হয়ে যেত নির্দিষ্ট ভাতার মধ্যে।ইশতিয়াক যখন আলমারির কাগজপত্র ঘাঁটছিলেন, মীরার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছিল। যেন কোনো গোপন দলিল হারিয়ে যাওয়ার ভয় তাকে গ্রাস করেছে।
তারপর আসে রাসায়নিকের প্রসঙ্গ। অরিন্দমের ব্যবসার খুঁটিনাটি বিষয়ে মীরা একেবারে অজ্ঞ ছিলেন না।ল্যাবরেটরিতে বহুবার তাকে দেখা গেছে।কোন রাসায়নিক কীভাবে কাজ করে—তার প্রাথমিক ধারণা ছিল।ঘটনার আগের দিন বিকেলে তাকে স্টোররুমে কিছু খুঁজতে দেখা গেছে বলে ও জানা যায়।
ইশতিয়াক শান্তভাবে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “সেদিন রাতে কফি কে দিয়েছিল?”
মীরা বলেছিলেন, “হরিপদ।”
“আপনি কি পরে ঘরে গিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ… তবে খুব অল্প সময়ের জন্য।” তার কণ্ঠে দ্বিধা ছিল।
এদিকে তদন্তে উঠে আসে আরেক বিস্ফোরক তথ্য।অরিন্দমের ছোট ভাই অয়ন কোম্পানির তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা সরিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে হারিয়েছেন। বিষয়টি জানার পর অরিন্দম ব্যবসা বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।ব্যবসা বিক্রি মানেই অয়নের আর্থিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
পাড়ার কয়েক জন জানিয়েছেন, গত কয়েক মাস ধরে ভাইদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ চলছিল।আবার অয়ন ও মীরাকে একাধিকবার ব্যক্তিগত আলাপ করতে দেখা গেছে।তাদের কথোপকথন ছিল নিচু স্বরে, গোপনীয়। তাহলে কি দুজনের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়েছিল? নাকি তারা আলাদা আলাদা কারণে একই ফল চেয়েছিল?
অন্যদিকে রয়েছে তৃতীয় মানুষটি—এই বাড়ির দীর্ঘদিনের কর্মচারী। নীরব, নিয়মিত, সবার ভরসার জায়গা।তার উপস্থিতি এতটাই স্বাভাবিক যে কেউ তাকে আলাদা করে ভাবেই না।অথচ কফি তিনিই দেন, গাছের পানি তিনিই দেন, স্টাডি রুমে যাতায়াত ও তারই সবচেয়ে বেশি। ইশতিয়াক ধীরে ধীরে বুঝতে পারলেন—এই খুন শুধু বিষের নয়, বিশ্বাসের। প্রশ্নগুলো একে একে মাথা তুলে দাঁড়ায়
— বিষ কি কফিতে ছিল না অন্য কোথাও?
বনসাইয়ের ভেজা মাটি কি কাকতালীয়?
উইল কি নিছক আর্থিক লড়াই, নাকি খুনের মোটিভ? নাকি এই পরিবারের বাইরের কেউ, যাকে এখনো সন্দেহের তালিকায় আনা হয়নি?
ঘর ভেতর থেকে বন্ধ।চাবি ভেতরেই। ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই। তবু ও মৃত্যু নিখুঁতভাবে সংগঠিত। এইমুহূর্তে সন্দেহের তালিকায় তিনজন—স্ত্রী, ভাই, আর বিশ্বস্ত সহকারী। কিন্তু ইশতিয়াক জানেন, কখনো কখনো আসল সত্য এমন জায়গায় লুকিয়ে থাকে, যেখানে চোখ যায়না।
সেন ভিলার ওপর যেন অদৃশ্য এক চাপা অন্ধকার নেমে এসেছে। প্রতিটি মানুষ আলাদা ঘরে থাকলেও, তাদের চিন্তা যেন একই জায়গায় আটকে—অরিন্দম সেনের শেষ রাত। আর সেই রাত টিকেই ভেঙে ভেঙে দেখার সিদ্ধান্ত নিলেন গোয়েন্দা ইশতিয়াক রহমান। তিনি ডাইনিং টেবিলে বসে একটি সাদা কাগজ বের করলেন।শান্ত গলায় বললেন, “আমরা অনুভূতি দিয়ে নয়, সময় দিয়ে এগোব।” তারপর শুরু হলো টাইমলাইন তৈরি।
রাত ১০:০০ — অরিন্দম স্টাডি রুমে প্রবেশ করেন।
১০:১৫ — কফি পৌঁছায়।
১০:৩০ থেকে ১১:০০ — বাড়ির ভেতরে হালকা পায়ের শব্দ কেউ একজন শুনেছে।
১১:২০ — স্টাডির আলো নিভে যায়।
ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বিষ শরীরে ঢোকার অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট পর তার প্রভাব শুরু হয়।অর্থাৎ, যদি মৃত্যু ঘটে থাকে প্রায় ১১ টার পর, তবে বিষ দেওয়া হয়েছিল ১০ টার কিছু আগে বা আশেপাশে।
কিন্তুপ্রশ্নহলো—কীভাবে?
কফিতে বিষ নেই।
গ্লাসে নেই।
খাবারে নেই।
তাহলে কি বিষ বাতাসে মিশেছিল?
ইশতিয়াক আবার স্টাডি রুমে ঢুকলেন। বনসাই গাছ গুলোর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।মাটিতে হাত দিলেন।শুকনো অংশের নিচে ভেজা স্তর।যেন উপরের আবরণ শুধু ঢেকে রাখার জন্য। তিনি স্প্রে বোতলটি পরীক্ষা করালেন।
রিপোর্ট এল—তাতে অর্গানো ফসফেটের ক্ষীণ চিহ্ন পাওয়া গেছে।তবে সমস্যা হলো, বোতলে একাধিক মানুষের আঙুলের ছাপ।অরিন্দম, মীরা, এমন কি বাড়ির অন্যদেরও। অর্থাৎ বোতলটি সবার হাতেই গেছে। রহস্য আরও গভীর হলো।
*** প্রস্তাবিত লিংক : ফিক্শন ফ্যাক্টরি তে আমার অন্যান লেখা
তল্লাশির একপর্যায়ে ইশতিয়াক একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস উদ্ধার করলেন—নতুন উইলের খসড়া।কিন্তু সেটি অসম্পূর্ণ। শেষ পাতাটি নেই।সই করা হয়নি। ডায়েরির পাশে রাখা ছিল সেটি।ডায়েরির শেষ লাইনে কাঁপা হাতে লেখা— “আমি ভুল মানুষটাকে বিশ্বাস করেছি…” এই বাক্য যেন পুরো বাড়ির বাতাস ভারীকরে দিল। মীরা সেনের মুখ শক্ত হয়ে গেল।অয়ন চোখ নামিয়ে নিল।
কাকে বিশ্বাস করেছিলেন অরিন্দম? স্ত্রীকে? ভাইকে? নাকি অন্য কাউকে? ফরেনসিকের হিসাব বলছে—বিষের প্রভাব শুরু হয়েছিল উইল সই করার আগেই। অর্থাৎ, খুনের উদ্দেশ্য কি উইল আটকানো? নাকি অন্য কিছু?
তদন্তে উঠে এল ব্যাংক স্টেটমেন্ট। বিপুল পরিমাণ অর্থ তহবিল থেকে সরানো হয়েছে।জুয়া, ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার—সব মিলিয়ে আর্থিক বিপর্যয়। অরিন্দম ব্যবসা বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। ব্যবসা বিক্রি মানেই অয়নের আর্থিক নিরাপত্তা শেষ।
ঘটনার আগের রাতে অয়নের ফোনে একাধিক কল আসে।কল রেকর্ডে দেখা যায় উত্তেজিত কথোপকথন। কিন্তু মোবাইল লোকেশন বলছে—সে বাড়ির ভেতরেই ছিল। অর্থাৎ সুযোগ ছিল।মোটিভ ও ছিল। কিন্তু সরাসরি প্রমাণ নেই।
সবচেয়ে বড় ধাঁধা—বন্ধ ঘর। দরজা ভেতর থেকে লক।চাবি টেবিলের ওপর। কিন্তু ইশতিয়াক খেয়াল করলেন অরিন্দম সাধারণত দরজা লক করলে চাবি দরজাতেই রেখে দিতেন। এবার চাবি টেবিলে কেন? কেউ কি বেরিয়ে গিয়ে কৌশলে বাইরে থেকে লক করেছে?
নাকি অরিন্দম নিজেই অসুস্থ বোধ করার পর উঠে দরজা লক করেছিলেন? যদি তাই হয়—তাহলে তিনি সাহায্য চাননি কেন? এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারছেনা। এখন সন্দেহ সমানভাবে তিনজনের ওপর দাঁড়িয়ে—
মীরা সেন — আর্থিক স্বার্থ, গোপন উইল, অসঙ্গত উত্তর।
অয়ন — তহবিল কেলেঙ্কারি, আর্থিক চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব।
বাড়ির বিশ্বস্ত সহকারী — যাতায়াতের সুযোগ, নীরব উপস্থিতি, দৈনন্দিন অভ্যাসের ঘনিষ্ঠতা।
কিন্তু প্রমাণ কাউকেই সরাসরি দোষী করছেনা। ইশতিয়াক ধীরে ধীরে বুঝতে পারলেন— এইখুন পরিকল্পিত। বিষ দেওয়া হয়েছেএমনভাবে, যেন মৃত্যু স্বাভাবিক মনে হয়।ঘর সাজানো হয়েছে এমনভাবে, যেন সবকিছু ঠিকঠাক লাগে। এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয়— খুনি জানত অরিন্দমের প্রতিদিনের অভ্যাস, সময়, একাকীত্ব।
রাত গভীর।সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। ইশতিয়াক একা স্টাডি রুমে দাঁড়িয়ে। তিনি হঠাৎ বনসাইয়ের টবটি উল্টে দিলেন।মাটি ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। মাটির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি ছোট কাঁচের শিশি। খালি। তিনি শিশিটি হাতে তুলে আলোয় ধরলেন। চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা।
“খুনি শুধু বিষ দেয়নি…” তিনি ফিসফিস করে বললেন, “সে জানত কখন দিতে হয়।”
কিন্তু প্রশ্ন এখনো রয়ে গেল— এই বাড়ির ভেতরেই কি সে লুকিয়ে আছে? নাকি সবাইকে ভুল পথে চালিত করে কেউ বাইরে থেকে সুতো টানছে? রহস্য এখন আরও গভীর।সত্য খুব কাছে… তবু নাগালের বাইরে।
সেদিন সন্ধ্যায় সেন ভিলার ড্রয়িং রুমে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছিল। বাইরে তখন কুয়াশা ধীরে ধীরে নেমে আসছে, লেকভিউ রোডের বাতিগুলো ম্লান আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাড়ির ভেতরে যেন সবাই অপেক্ষা করছে—কোনো অদৃশ্য উত্তরের জন্য। ইশতিয়াক রহমান সবাইকে ড্রয়িং রুমে বসতে বলেছিলেন। বড় সোফার একপাশে বসে আছেন মীরা দেবী।
মুখে অদ্ভুত কঠোরতা, কিন্তু চোখের ভেতরে যেন চাপা অস্থিরতা। তার বিপরীতে বসে অয়ন সেন—চোখ নামানো, দুই হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। আর একটু দূরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির বিশ্বস্ত সহকারী হরিপদ। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন ইশতিয়াক। তার হাতে একটি ছোট স্প্রে বোতল। এই বোতলটাই যেন পুরো রহস্যের কেন্দ্র। তিনি ধীরে ধীরে চারদিকে তাকালেন।
তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন— “আজ আমরা দেখব কীভাবে একটি খুব সাধারণ অভ্যাস, একটি নিঃশব্দ মুহূর্ত, এবং একটি ভুল সিদ্ধান্ত—একটি মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে।”
কেউ কথা বলল না। ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। ইশতিয়াক আবার বললেন—
“আমি এখনো কাউকে খুনি বলছি না। কারণ এই ঘটনাটা এত সহজ নয়। প্রথম দেখায় যাকে দোষী মনে হয়, সত্যি অনেক সময় তার উল্টোটা হয়।”
মীরা দেবী একটু নড়ে বসেন। অয়ন মাথা তুলতে গিয়েও থেমে যায়। ইশতিয়াক স্প্রে বোতলটি টেবিলের ওপর রাখলেন।
“অরিন্দম সেনের একটি অভ্যাস ছিল,” তিনি বললেন। “প্রতিদিন রাতে কাজ করার সময় তিনি তার প্রিয় বনসাই গাছটিতে জল স্প্রে করতেন।”
*** আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের অনুপ্রেরণামূলক জীবনী: বইপড়া আন্দোলনের পথিকৃৎ
ঘরের কোণে রাখা ছোট্ট বনসাই গাছটির দিকে সবাই একবার তাকাল। সবুজ পাতায় মৃদু আলো পড়ছে। নিরীহ, নিস্তব্ধ। কিন্তু সেই গাছই যেন এখন পুরো ঘটনার কেন্দ্রে। ইশতিয়াক ধীরে বললেন— “খুনি এই অভ্যাসটা খুব ভালোভাবে জানত। সে জানত ঠিক কখন অরিন্দম বাবু একা থাকবেন, কখন তিনি এই স্প্রে বোতল ব্যবহার করবেন। তাই সে এই বোতলের জলের মধ্যে খুব অল্প পরিমাণে অর্গানোফসফেট বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল।”
মীরা দেবীর চোখ বড় হয়ে গেল।
“আপনি কি বলতে চাইছেন—” তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, “আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন?”
তার গলায় ভয় আর রাগ মিশে গেছে। ইশতিয়াক মাথা নাড়লেন। “না, মীরা দেবী। আমি জানি আপনি ওই রাতে স্টাডি রুমে গিয়েছিলেন। কিন্তু খুন করার জন্য নয়।” ঘরের সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে।
ইশতিয়াক বললেন— “যদিও আপনি চাইলেই কাজটি করতে পারতেন। কিন্তু আপনি গিয়েছিলেন উইলের কাগজ খুঁজতে। নতুন উইল কোথায় আছে সেটা জানার জন্য। হয়তো আপনি ভয় পেয়েছিলেন—আপনার স্বামী সম্পত্তির ভাগ বদলে দিতে পারেন।”
মীরা দেবীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন।
ইশতিয়াক শান্তভাবে বললেন— “হ্যাঁ, আপনি ভুল করেছেন। আপনি একটি নথি চুরি করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু খুনের সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই।”
ড্রয়িং রুমে আবার নীরবতা নেমে এল। অয়ন ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে একধরনের অস্থিরতা। ইশতিয়াক এবার তার দিকে তাকালেন।
“অয়ন বাবু,” তিনি বললেন, “আপনার অবস্থাও খুব ভালো ছিল না।” অয়ন কিছু বলল না।
ইশতিয়াক বলতে লাগলেন—
“ব্যাংক স্টেটমেন্ট আমরা দেখেছি। কোম্পানির তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা সরানো হয়েছে। জুয়া, ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার—সব মিলিয়ে আপনার আর্থিক অবস্থা ভেঙে পড়েছিল।”
অয়ন দাঁত চেপে বসে রইল।
“অরিন্দম বাবু যদি ব্যবসা বিক্রি করে দিতেন,” ইশতিয়াক বললেন, “তাহলে আপনার সব কেলেঙ্কারি প্রকাশ পেয়ে যেত। তাই আপনারও মোটিভ ছিল।”
এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, যেন অয়ন কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু ইশতিয়াক হাত তুলে তাকে থামালেন।
“তবে,” তিনি ধীরে বললেন, “খুন করার জন্য শুধু মোটিভ থাকলেই হয় না। দরকার জ্ঞান। দরকার পরিকল্পনা। দরকার এমন কিছু বোঝাপড়া—যা আপনার ছিল না।”
অয়ন নিঃশ্বাস ফেলল। তবে "বিশ্বাস করে ভুল করেছি" কথাটা উনি বোধহয় আপনার উদ্দেশ্যে লিখেছেন।
ইশতিয়াক এবার ধীরে ধীরে তাকালেন সেই মানুষটির দিকে—যে এতক্ষণ প্রায় অদৃশ্যের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। হরিপদ। বছরের পর বছর এই বাড়িতে কাজ করছে। শান্ত, ভদ্র, অনুগত। কেউ কখনো তাকে নিয়ে সন্দেহ করেনি। ইশতিয়াক একটু এগিয়ে এলেন। “হরিপদ,” তিনি বললেন, “আপনি একসময় নার্সিং হোমে কাজ করতেন, তাই না?” হরিপদ চমকে উঠল। তার চোখে আতঙ্কের ছাপ। ইশতিয়াক বললেন— “সেখানে আপনি ওষুধ, রাসায়নিক এবং কীটনাশক সম্পর্কে অনেক কিছু শিখেছিলেন। আপনি জানতেন কোন বিষ কীভাবে কাজ করে।”
হরিপদের ঠোঁট কাঁপছে। ইশতিয়াক এবার স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন— “আপনি জানতেন অর্গানোফসফেট বিষ চামড়ার মাধ্যমে শরীরে ঢুকতে পারে। ধীরে কাজ করে। প্রথমে অসুস্থতার মতো লাগে।”
ঘরের সবাই স্তব্ধ। ইশতিয়াক বললেন—
“সেদিন রাতে আপনি স্প্রে বোতলের জলে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিলেন। যখন অরিন্দম বাবু বনসাই স্প্রে করলেন, তখন সেই বিষ তার হাতে লেগে গেল।”
তিনি একটু থামলেন। তারপর ধীরে বললেন— “সেই হাতেই তিনি কফি খেলেন। ল্যাপটপ ব্যবহার করলেন। ধীরে ধীরে বিষ তার শরীরে কাজ শুরু করল। তিনি ভাবলেন, হয়তো শরীরটা খারাপ লাগছে।”
হরিপদের মুখ দিয়ে ঘাম পড়ছে। ইশতিয়াক এবার ডায়েরির দিকে তাকালেন। “ডায়েরিতে লেখা ছিল—‘আজ সিদ্ধান্ত নেব।’”
তিনি বললেন— “সেই সিদ্ধান্ত ছিল আপনাকে বিদায় করার। অরিন্দম বাবু বুঝতে পেরেছিলেন আপনি কিছু ভুল করছেন।”
এই কথাটা যেন শেষ আঘাত। হরিপদ হঠাৎ ভেঙে পড়ল। সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মেঝেতে। তার গলা কেঁপে উঠল।
“আমি মারতে চাইনি হুজুর…” সে কাঁদতে কাঁদতে বলল। “আমি শুধু চেয়েছিলাম উনি কয়েকদিন অসুস্থ থাকুন… যাতে আমাকে কাজ থেকে না ছাড়েন… আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না…”
ঘরটা নিঃশব্দ। মীরা দেবী স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। অয়ন যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। ইশতিয়াক ধীরে বললেন—
“এটাই সবচেয়ে কঠিন সত্য। অনেক সময় অপরাধীরা জন্মগত খুনি নয়। তারা ভয় পায়। নিজেদের বাঁচাতে গিয়ে এমন একটা ভুল করে বসে—যার ফল আর ফেরানো যায় না।”
পরদিন সকালে কুয়াশা কেটে সূর্যের আলো পড়ছিল লেকভিউ রোডে। পুলিশ হরিপদকে নিয়ে যাচ্ছে। তার মাথা নিচু। ইশতিয়াক শেষবারের মতো স্টাডি রুমে ঢুকলেন। ঘরের কোণে সেই ছোট বনসাই গাছটি দাঁড়িয়ে আছে। সবুজ। সতেজ। নীরব। তিনি কিছুক্ষণ গাছটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন— “মানুষ হঠাৎ করে খুনি হয় না… কখনও কখনও পরিস্থিতিই তাকে সেই পথে ঠেলে দেয়।”
ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল। অরিন্দম সেন নেই। রহস্যের সমাধান হয়েছে। কিন্তু স্টাডি রুমের কোণে সেই ছোট বনসাই গাছটি দাঁড়িয়ে রইল— একটি নিঃশব্দ হত্যার সাক্ষী হয়ে। এবং যেন মনে করিয়ে দিল— মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল কখনও কখনও বিশ্বাসের ভুল।
📚 আরও রহস্য, গল্প আর নতুন কল্পনার জগতে যেতে চান? এই গল্পটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে আমার অন্যান্য বাংলা গল্পগুলোও নিশ্চয়ই আপনার আগ্রহ জাগাবে। প্রতিটি গল্পে আছে নতুন রহস্য, নতুন চরিত্র এবং ভিন্ন স্বাদের কাহিনি। আমার অন্যান্য বাংলা গল্প পড়তে ঘুরে আসতে পারেন—
📖 প্রতিলিপি: Bangla Story Profile
💻 Digital Pencil: Bangla Website
🎥 Talent Stage: Bangla YouTube Channel
সময় পেলে একবার হলেও এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে ঘুরে আসুন। আশা করি নতুন গল্প আর সৃজনশীল কাজগুলো আপনার ভালো লাগবে। ✨
0 মন্তব্যসমূহ